মারিনা আবরামোভিচ: মানুষের আসল চেহারা উন্মোচনের একটি অভূতপূর্ব পারফরম্যান্স
১৯৭৪ সালে ইতালির একটি হলে মারিনা আবরামোভিচ নামের এক নারী শিল্পী একটি ব্যতিক্রমী এবং চমকপ্রদ পারফরম্যান্সের আয়োজন করেছিলেন। পারফরম্যান্সটির নাম ছিল "Rhythm 0", যা মানব মনোবৃত্তি এবং আচরণের অন্ধকার দিকগুলো প্রকাশ করার এক দুঃসাহসী প্রচেষ্টা।
মারিনা হলে প্রবেশ করেন হাতে একটি কাগজ নিয়ে, যেখানে লেখা ছিল,
"আমি এখানে ছয় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকব। আমাকে একটি বস্তু হিসেবে গণ্য করুন। এই সময়ে আপনারা আমার সঙ্গে যা খুশি করতে পারেন, এর সম্পূর্ণ দায়ভার আমার।"
সন্ধ্যা ৮টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত, মারিনা তার শরীর এবং সম্মানকে সম্পূর্ণরূপে অপরিচিতদের ইচ্ছাধীন করে দেন।
হলে একটি টেবিল সাজানো ছিল বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে—গোলাপ, পাউডার, মধু, আঙুর, ব্লেড, কাঁটা, পিস্তল, কনডম এবং অন্যান্য বস্তু, যেগুলো দিয়ে তার প্রতি সদয় অথবা নিষ্ঠুর যেকোনো আচরণ করা সম্ভব। শুরুতে দর্শকরা তাকে হালকাভাবে স্পর্শ করছিল, গায়ে ঠেলা দিচ্ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের লুকিয়ে থাকা হিংস্রতা এবং পাশবিকতা প্রকাশ পেতে শুরু করল।
কেউ তার শরীরের পোশাক খুলে ফেলল, কেউ ব্লেড দিয়ে শরীর কেটে রক্তাক্ত করল। কেউ গায়ে কাঁটা গুঁজে দিল, আরেকজন যৌন নিপীড়নে লিপ্ত হলো। এমনকি এক ব্যক্তি টেবিলের পিস্তলটি হাতে নিয়ে সেটি তার কপালে ধরে দেখল যে সত্যিই গুলি চালাতে পারে কি না। মারিনার নীরবতা এবং অসহায়তা তাদের নির্মমতাকে আরও উসকে দিয়েছিল।
এই ছয় ঘণ্টার বিভীষিকার পর, সময় শেষ হলে মারিনা ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করলেন। তিনি একে একে সেই মানুষদের দিকে এগিয়ে গিয়ে তাদের চোখে চোখ রেখে দাঁড়ালেন। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয়, যেসব মানুষ এতক্ষণ তার সঙ্গে পাশবিক আচরণ করেছিল, তারা কেউ তার চোখে তাকাতে পারল না। একেকজন লজ্জিত হয়ে দ্রুত সরে পড়ল।
মানব প্রকৃতির নির্মম সত্য
মারিনার এই পারফরম্যান্সের উদ্দেশ্য ছিল মানুষের অন্তর্নিহিত রাক্ষসকে উন্মোচিত করা। এটি দেখিয়েছে, ক্ষমতা অথবা প্রতিবাদহীনতার সুযোগ পেলে মানুষ কীভাবে পাশবিক হয়ে উঠতে পারে। যখন কাউকে একেবারে অসহায় বা নিস্তেজ অবস্থায় পাওয়া যায়, তখন অনেকেই তাদের মনোভাব ও চরিত্রের অন্ধকার দিক প্রকাশ করে।
এই পারফরম্যান্স একধরনের সমাজ গবেষণাও ছিল, যা দেখিয়েছে, রাক্ষসদের জন্য বনে-জঙ্গলে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। মানুষের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে রাক্ষস। অনেক মানুষ, যারা সাধারণ অবস্থায় সভ্যতার মুখোশ পরে থাকে, সুযোগ পেলেই তাদের অন্তরের বর্বরতা প্রকাশ করে।
পাঠের শিক্ষা
মারিনার এই পারফরম্যান্স আমাদের গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা দেয়—আমরা যেন আমাদের চারপাশের "মানুষরূপী জন্তু-জানোয়ার" থেকে সচেতন থাকি। আমরা যেন সহিংসতা, অন্যায় এবং অমানবিক আচরণকে প্রশ্ন করি এবং এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই। মানুষের অন্তরে লুকিয়ে থাকা হিংস্রতাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নৈতিকতা, সহানুভূতি এবং মানবিকতাই একমাত্র পথ।
তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া
